সুনামগঞ্জ , রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে দুই কিশোর আটক জন্মজয়ন্তীতে কবি নজরুল ইসলামকে স্মরণ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র‌্যালি গাছের সঙ্গে ট্রাকের ধাক্কায় শ্রমিক নিহত, অটোরিকশার চাপায় প্রাণ গেল ৬ বছরের শিশুর পুশইনে মরিয়া বিএসএফ, সীমান্তে উত্তেজনা মে মাসে গণপিটুনি ও সহিংসতায় নিহত ৩১, ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী ও শিশু বাদাম চাষে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও ফলন নিয়ে শঙ্কা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীকে ছাড় দেওয়া হবে না ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় অনিয়ম, ক্ষোভে ফুঁসছেন বঞ্চিতরা টাঙ্গুয়ার হাওরে নিভে গেল ছোট্ট সৌম্যতার জীবনপ্রদীপ তাহিরপুরে ঈদ পুনর্মিলনী ও আলোচনা সভায় এমপি কামরুল মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না : মির্জা ফখরুল শিশুর হাতে স্মার্টফোন : আশীর্বাদ না অভিশাপ? হাওরের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের দাবি টাঙ্গুয়ার হাওরে উজাড় হচ্ছে হিজল-করচ বাগ সাম্রাজ্যবাদী ও দেশবিরোধী সব চুক্তি বাতিলের দাবি “সমন্বয়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন হান্নান মাসউদ” গুপ্ত ছিলাম, বাইরে যাইনি, ভবিষ্যতেও পালাবো না : জামায়াত আমির প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হলেন যাঁরা
৫শ কোটি টাকা ব্যয়ে হাওরে ভূউপরিস্থ উন্নয়ন প্রকল্প

চাষের আওতায় আসছে হাওরের পতিত জমি

  • আপলোড সময় : ২৫-১২-২০২৫ ০৯:১৪:০৬ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৫-১২-২০২৫ ০৯:১৯:৩৬ পূর্বাহ্ন
চাষের আওতায় আসছে হাওরের পতিত জমি ছবি: ফাইল থেকে
শামস শামীম ::
সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের চার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে পতিত জমি চাষাবাদ, খাল-পাহাড়ি নালা খনন, হাওরের গোপাট পাকাকরণ, কৃষক প্রশিক্ষণ প্রদানসহ নানা কার্যক্রমে কৃষি উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম শেষ হবে ২০২৯ সালে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রায় ৫শ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় ১৭ হাজার ১৯ হেক্টর পতিত জমির সেচ সুবিধায় আসবে। প্রায় ৫১ হাজার ৫৮ মে.টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদিত হবে।
প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৯ সাল পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদী প্রকল্প সম্পন্ন হলে জলবায়ু প্রভাব মোকাবেলা করে কৃষক নানা প্রশিক্ষণ পেয়ে পানির সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহার করে চাষাবাদের সুযোগ পাবেন। এতে ধান এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদনও বাড়বে। বাস্তবায়িত প্রকল্পে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাল ও পাহাড়ি নালা খননের ফলে মাছেরও উৎপাদন বৃদ্ধি হবে। কৃষকের আয় ও জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়িয়ে ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা কমানো ও পানির সঠিক ও টেকসই ব্যবহারও নিশ্চিত করবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, প্রকল্পের আওতায় ১৫ হাজার ৩৩৯ ভূউপরিস্থ জমির পানি এবং ১ হাজার ৬৮০ হেক্টর ভূগর্ভস্থ জমির পানি সেচ সরবরাহে জুন মাস থেকে কাজ শুরু হয়েছে। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষক সক্ষমতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও শুকনো মওসুমে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করতে খাল খনন, রাবার ড্যাম, রেগুলেটর সংস্কার, কালভার্ট নির্মাণে বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্পের কাজ চলছে। গভীর নলকূপ স্থাপন ও কৃষক সক্ষমতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের প্রস্তুতিও শেষ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরসিসি গোপাট নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় খুশি কৃষকরা। গোপাট নির্মিত হলে কৃষকরা সহজে বোরো মওসুমে নৌপথে ও গাড়িতে করে হাওর থেকে ধান বাড়িতে নিয়ে আসতে পারবেন। এতে তাদের সময় ও অর্থ অপচয় কম হবে।

সুনামগঞ্জ বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ৫ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পে হাওর জেলা সুনামগঞ্জে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর পতিত জমি চাষের আওতায় আসবে। পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে খনন করা হবে ৭০ কিলোমিটার খাল ও পাহাড়ি নালা, ১০টি গভীর নলকূপ স্থাপন, ৩০টি পুরাতন স্কীম সংস্কার, ১৫টি কালভার্ট নির্মাণ, দুটি স্লুইসগেট নির্মাণ, ৪টি গোপাট নির্মাণ এবং প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করা হবে। প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রকল্পে চার জেলায় ২২১ কি.মি. খাল ও পাহাড়ি নালা খনন, ১০৫ কি. মি. খাল ও পাহাড়ী ছড়া সংস্কার করা হবে। খননের ফলে খালে পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং খননকৃত খালে বন্যা ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সঞ্চিত পানি দিয়ে আমন ও রবি মৌসুমে সম্পূরক সেচের ব্যবহার করা হবে। এতে ২ হাজার ৬৮১ হেক্টর জমি ভূ-পরিস্থ পানির ব্যবহার গবে। উজান থেকে হঠাৎ নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে নিমজ্জিত হাওর এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা খাল, নালা, পাহাড়ী ছড়া পুনঃখনন ও সংস্কারের মাধ্যমে আগাম বন্যা থেকে প্রায় ৭ হাজার ৯০০ হেক্টর জমি রক্ষা পাবে এবং ৫ কি.মি. বারিড পাইপ লাইন নির্মাণের ফলে ১৬৭ হেক্টর জমির স্থায়ী জলাবদ্ধতা দূর হবে। এতে ৮ হাজার ৬৭ হেক্টর বোরো জমির প্রায় ২৪ হাজার ২০০ মে.টন ফসল সুরক্ষা পাবে। এছাড়াও প্রকল্পে ১১০টি ৫-কিউসেক এলএলপি, ৪০টি ২-কিউসেক এলএলপি, ৮টি ১-কিউসেক এলএলপি, ৪০টি ১.৫-কিউসেক ফোর্সমোড পাম্প স্থাপনসহ ৩৬৭.৬ কি. মি. ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ০.৫-কিউসেক উচ্চ হেডের পাম্পের সাহায্যে ২০টি স্প্রীংকলার সেচ পদ্ধতি প্রয়োগ, ৪০টি আর্টেশিয়ান নলকূপ স্থাপন এবং ৫টি ফোর্সমোড নলকূপ পুনর্বাসন করে ১০ হাজার ৩২ হেক্টর কৃষি জমি আধুনিক সেচের আওতায় চলে আসবে। পুরাতন ১৮০টি সেচ স্কিমে ১৭৬ কি. মি. বর্ধিত করে ৫শ ৪৩.৬ কি.মি ভূ-গর্ভস্থ নির্মাণ করে সেচের পানির অপচয় রোধ হবে। প্রকল্পে ৮০টি ওয়াটার পাস, ক্যাটল ক্রসিং, ফুট ব্রীজ, পাইপ স্লুইসসহ ক্ষুদ্রাকার সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ১০টি রেগুলেটর, সাবমার্জড ওয়ার, ক্রস ড্যাম, সাইফন, কনডুইট নির্মাণের মাধ্যমে মধ্যমাকার সেচ অবকাঠামো করে প্রায় ১ হাজার হেক্টর কৃষি জমি আধুনিক সেচের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তাছাড়াও বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণ, নিষ্কাশন, চলাচলে ৯০টি অবকাঠামো ব্যাবহার করে কৃষকরা সহজে হাওর থেকে ফসল পরিবহন করতে পারবেন। কৃষকদের ফসল পরিবহনে অন্তত ১০ কিলোমিটার গোপাট নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পে ৯শ মেকানিক, ম্যানেজার, অপারেটর, ফিল্ডসম্যান, কৃষক এবং কৃষাণীকে ‘সেচ ব্যবস্থাপনা, সেচযন্ত্র রক্ষণাবেক্ষন, খাদ্যশস্য ও বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সবজি উৎপাদন’ বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে কৃষিতে বিশেষ দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। কঠোর নজরদারির দাবি হাওর আন্দোলনের : কৃষি উন্নয়নে যুগান্তকারী এই পদক্ষেপকে হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দসহ কৃষকরা সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে কার্যক্রম বাস্তবায়নের সময় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তারা জানিয়েছেন ড্রেন, কালভার্ট ও রেগুলেটর নির্মাণ এবং খাল খননে যেসব ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় তারা দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে নি¤œমানের কাজ করে। খাল খনন না করেই বরাদ্দ লোপাট করার ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। ড্রেন নির্মাণের পর ১ বছর না যেতেই ধসে পড়েছে। কালভার্ট ও রেগুলেটর নির্মাণেও অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা হয়েছে। তাই এসব কাজ যাতে যথাযতভাবে বাস্তবায়ন হয় সেদিকে কঠোর নজরদারির জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। সুনামগঞ্জের শ্রমিক আন্দোলনের নেতা সাইফুল আলম সদরুল বলেন, বিএডিসি সরকারের কৃষি উন্নয়নের আদি প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নে যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে তা যুগান্তকারী। তবে প্রকল্পের কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। না হলে সরকারি বরাদ্দের যাচ্ছেতাই ব্যবহার হবে এবং কৃষিতে কাক্সিক্ষত পরিবর্তনও আসবেনা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতা ও হাওরের গোপাট নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে কথা বলা অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, হাওরের গোপাট পাকা করা হলে কৃষক সহজে নৌপথে ও সড়কপথে ধান পরিবহন করতে পারবে। এতে খরচ ও সময় বাঁচবে। তবে প্রকল্পের খাল, পাহাড়ি নালা খনন ও সংস্কার, রেগুলেটর ও কালভার্ট নির্মাণে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এই কাজে প্রচুর অনিয়ম হয়। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুনামগঞ্জসহ চার জেলায় কৃষিতে বিরাট পরিবর্তন আসবে।
সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী প্রনজিত কুমার দেব বলেন, প্রায় ৫ বছর প্রচেষ্টার পর প্রকল্পটি চলতি অর্থ বছর থেকে শুরু হয়েছে। প্রকল্পে খাল-পাহাড়ি নালা খনন, পতিত জমি চাষের আওতায় আনা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, গোপাট নির্মাণ, পুরাতন প্রকল্প সংস্কার, গভীর নলকূপ স্থাপনসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে। ইতোমধ্যে কাজও শুরু হয়ে গেছে। প্রকল্পে যাতে কোনও অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা না হয় সেদিকে আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স